তাকবীরে তাশরীক হলো জিলহজ মাসের ৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত প্রতিটি ফরজ নামাজের পর পড়া বিশেষ একটি তাকবীর। এটি ওয়াজিব — অর্থাৎ ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দিলে গুনাহ হবে। এই পোস্টে আপনি জানতে পারবেন এর ইতিহাস, অর্থ, কখন পড়তে হয়, কার উপর ওয়াজিব এবং অনেক প্রয়োজনীয় মাসআলা।
তাকবীরে তাশরীক কী?
তাকবীরে তাশরীক বলতে বোঝায় জিলহজ মাসের নির্দিষ্ট দিনগুলোতে প্রতিটি ফরজ নামাজের সালাম ফেরানোর পরপরই একটি নির্দিষ্ট তাকবীর (আল্লাহর মহত্ত্ব ঘোষণা) পড়া। “তাশরীক” শব্দটি আরবি “শারাকা” ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ রোদে মাংস শুকানো। কারণ এই দিনগুলোতে কুরবানির মাংস রোদে শুকানো হতো।
ইসলামি পরিভাষায়, আইয়ামে তাশরীক বলতে জিলহজের ১১, ১২ ও ১৩ তারিখকে বোঝানো হয়। আর তাকবীরে তাশরীক পড়া শুরু হয় ৯ জিলহজ ফজর থেকে। ওয়াজিব আমলজিলহজ মাসেফরজ নামাজের পরহজের আমল।
তাকবীরে তাশরীকের ইতিহাস ও উৎপত্তি
তাকবীরে তাশরীকের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। এর শিকড় প্রোথিত আছে হযরত ইবরাহিম (আ.) ও হযরত ইসমাঈল (আ.) এর মহান কুরবানির ঘটনায়।
হযরত ইবরাহিম (আ.) ও কুরবানির সাথে সম্পর্ক
হযরত ইবরাহিম (আ.) যখন আল্লাহর নির্দেশে তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাঈল (আ.)-কে কুরবানি দিতে উদ্যত হন, তখন আল্লাহ তায়ালা জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে একটি দুম্বা পাঠান এবং ঘোষণা দেওয়া হয় — “আল্লাহু আকবার”। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের স্মরণেই তাকবীরের এই বিশেষ আমলটি প্রবর্তিত হয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা কুরআনে এই দিনগুলোকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। সূরা আল-বাকারায় (২:২০৩) বলা হয়েছে, “নির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহকে স্মরণ করো।” বেশিরভাগ মুফাসসিরের মতে, এই নির্দিষ্ট দিনগুলো হলো আইয়ামে তাশরীক।
সাহাবায়ে কিরামের আমল
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর যুগ থেকেই এই তাকবীর পড়া হতো। হযরত আলী (রা.) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে তারা ৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত এই তাকবীর পড়তেন। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এই মতকেই গ্রহণ করেছেন।
তাকবীরটি কী এবং এর অর্থ
এই তাকবীরটি একবার পড়লেই ওয়াজিব আদায় হয়ে যায়। তবে তিনবার পড়া উত্তম। তাকবীরটি উচ্চস্বরে পড়া সুন্নাত — তবে মহিলারা নিচুস্বরে পড়বেন।
কখন থেকে কখন পর্যন্ত পড়তে হয়?
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী তাকবীরে তাশরীক পড়ার সময়কাল নিম্নরূপ:
শাফেঈ মাজহাবের মতে তাকবীরে তাশরীক পড়ার সময় একটু ভিন্ন — তারা ৭ জিলহজ থেকে শুরু করার মত দেন। তবে আমাদের উপমহাদেশে হানাফি মাজহাবই অনুসৃত হয়।
তাকবীরটি কেবল ফরজ নামাজের পর পড়তে হবে। সুন্নাত, নফল, বিতর বা জানাযার নামাজের পর পড়তে হয় না।
কার উপর ওয়াজিব?
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী নিচের শর্তগুলো পূরণ হলে তাকবীরে তাশরীক পড়া ওয়াজিব: পুরুষ ও মহিলা উভয়ের উপরই ওয়াজিব, মুকিম বা মুসাফির, মুকিম (স্থায়ী বাসিন্দা) হওয়া শর্ত, নামাজ পড়ার ধরন, জামাতে বা একাকীতে উভয় ক্ষেত্রে,প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমান
মুসাফিরের ক্ষেত্রে কী হবে?
মুসাফির (যিনি ৪৮ মাইলের বেশি দূরে সফরে আছেন) নিজে একা নামাজ পড়লে তার উপর তাকবীরে তাশরীক ওয়াজিব নয়। তবে যদি তিনি মুকিম ইমামের পেছনে নামাজ পড়েন, তাহলে তাকবীর পড়বেন।
সহজ নিয়ম
আপনি যদি নিজের শহরে থাকেন এবং প্রতিদিনের ফরজ নামাজ পড়েন — তাহলে আপনার উপর তাকবীরে তাশরীক পড়া ওয়াজিব।
কীভাবে পড়বেন?
পুরুষদের জন্য
ফরজ নামাজের সালাম ফেরানোর সাথে সাথে উচ্চস্বরে একবার তাকবীরটি পড়বেন। ইমাম পড়লে মুক্তাদিরাও পড়বেন।
মহিলাদের জন্য
মহিলারা নিচুস্বরে পড়বেন। কারণ মহিলাদের জন্য উচ্চস্বরে তাকবীর পড়া মাকরূহ।
একা নামাজ পড়লে
একাকী নামাজ পড়লেও তাকবীরটি পড়তে হবে। একাকী পড়লে মাঝারি আওয়াজে পড়া যায়।
গুরুত্বপূর্ণ
ইমাম তাকবীর না পড়লেও মুক্তাদিকে পড়তে হবে। কারণ এটি ওয়াজিব, শুধু সুন্নাতে মুয়াক্কাদা নয়।
তাকবীর ভুলে গেলে কী করবেন?
যদি কেউ ভুলে তাকবীরে তাশরীক না পড়েন, তাহলে যতক্ষণ মসজিদ থেকে বের না হন বা কথা না বলেন, ততক্ষণ পর্যন্ত পড়ে নিতে পারবেন। মসজিদ থেকে বের হলে বা কথা বললে আর পড়া যাবে না — তবে কোনো কাফফারা বা সিজদায়ে সাহু দিতে হবে না।
কাজা নামাজে তাকবীর পড়তে হবে?
যদি কেউ তাশরীকের দিনগুলোতে কোনো নামাজ কাজা করেন এবং পরে সেই দিনগুলোতেই আদায় করেন, তাহলে তাকবীর পড়তে হবে। কিন্তু দিনগুলো শেষ হওয়ার পরে কাজা আদায় করলে তাকবীর পড়তে হবে না।
জুমার নামাজে কী করবেন?
জুমার নামাজও ফরজ নামাজ — তাই জুমার সালাম ফেরানোর পরেও তাকবীরে তাশরীক পড়তে হবে।
ইমাম যদি না পড়েন?
অনেক সময় ইমাম ভুলে তাকবীর না পড়লে মুক্তাদিরা নিজেরা পড়ে নেবেন। এটি ওয়াজিব, তাই ইমামের অনুসরণ করে বাদ দেওয়া যাবে না।
যা করা যাবে না
ইচ্ছাকৃতভাবে তাকবীরে তাশরীক ছেড়ে দেওয়া গুনাহের কাজ। এটি ওয়াজিব হওয়ার কারণে ছেড়ে দিলে তওবা করতে হবে।
তাকবীরে তাশরীকের ফজিলত
তাকবীরে তাশরীকের ফজিলত অপরিসীম। কুরআন ও হাদিসের আলোকে এই দিনগুলোর বিশেষ মর্যাদা রয়েছে:
এই তাকবীর পড়ার মাধ্যমে আমরা ঘোষণা করি যে আল্লাহই সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সমস্ত প্রশংসা তাঁরই প্রাপ্য। এটি একইসাথে হযরত ইবরাহিম (আ.) এর কুরবানির ঘটনাকেও স্মরণ করিয়ে দেয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
তাকবীরে তাশরীক কি ফরজ নাকি ওয়াজিব?
তাকবীরে তাশরীক কতবার পড়তে হয়?
মহিলারা কি একা ঘরে নামাজ পড়লেও তাকবীর পড়বেন?
তাকবীরে তাশরীক কি মোবাইলে লিখে রাখা যায়?
সফরে থাকলে কি তাকবীরে তাশরীক পড়তে হবে?
তাকবীরে তাশরীক ও ঈদের তাকবীর কি একই?
উপসংহার
তাকবীরে তাশরীক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইসলামিক আমল যা আমাদের হযরত ইবরাহিম (আ.) এর মহান কুরবানির ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং আল্লাহর মহত্ত্ব ঘোষণার সুযোগ দেয়। জিলহজের ৯ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত প্রতিটি ফরজ নামাজের পর এই তাকবীর পড়তে ভুলবেন না। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই আমলটি যথাযথভাবে পালন করার তওফিক দান করুন। আমীন।
Related posts:
আমি মো: আলামিন এই ওয়েবসাইটে আমি প্রতিনিয়ত প্রযুক্তি বিষয়ক তথ্য দিয়ে থাকি।